স্লাইডশো

Loading...

শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১১

হাদীস

** হযরত আবু কাতাদাহ ইবনে রিবঈ (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, আল্লাহ তায়ালা বলিতেছেন, আমি তোমার উম্মতের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করিয়াছি এবং আমি এই দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছি যে, যে ব্যক্তি এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাযকে সময়মত আদায় করিবার এহতেমাম করিয়া আমার নিকট আসিবে আমি তাহাকে বেহেশতে প্রবেশ করাইব। আর যে ব্যক্তি নামাযের এহতেমাম করে নাই তাহার জন্য আমার কোন দায়িত্ব নাই। (ইচ্ছা হইলে মাফ করিব, আর না হয় শাস্তি দিব।) -আবু দাউদ

     ** হযরত আবদুল্লাহ ইবনে র্কুত (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাযের হিসাব করা হইবে। যদি নামায ঠিক থাকে তবে বাকি সব আমলও ঠিক হইবে। আর যদি নামায খারাপ হইয়া থাকে তবে বাকি আমলও খারাপ হইবে। (তাবারানী, তারগীব)

     ** হযরত জাবের (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আরয করিল, অমুক ব্যক্তি (রাত্রে) নামায পড়ে আবার সকাল হইতেই চুরি করে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, তাহার নামায অতিসত্বর তাহাকে এই খারাপ কাজ হইতে রুখিয়া দিবে। (বায্যার, মাজমা)

     ** হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, যে ব্যক্তি আমানতদার নহে সে কামেল ঈমানদার নহে। যাহার অযূ নাই তাহার নামায আদায় হয় নাই। আর যে ব্যক্তি নামায পড়ে না তাহার কোন দ্বীন নাই। দ্বীনের মধ্যে নামাযের মর্যাদা এমন যেমন শরীরের মধ্যে মাথার মর্যাদা। অর্থাৎ মাথা ব্যতীত মানুষ জীবিত থাকিতে পারে না তদ্রুপ নামায ব্যতীত দ্বীন বাকি থাকিতে পারে না। (তাবারানী, তারগীব)

     ** হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, যদি দ্বিপ্রহরের গরমে জোহরের নামাযের জন্য মসজিদে যাওয়ার ফযীলত লোকেরা জানিত তবে জোহরের নামাযের জন্য দৌড়াইয়া যাইত। আর যদি এশা ও ফজরের নামাযের ফযীলত জানিত তবে (অসুস্থতার দরুন) হামাগুড়ি দিয়া হইলেও এই নামাযের জন্য মসজিদে যাইত।  (বোখারী)

     ** হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, আমার ইচ্ছা হয় যে, কতিপয় যুবককে বলি যে, তাহারা অনেকগুলি লাকড়ি জোগাড় করিয়া আনে। অতপরঃ আমি ঐ সকল লোকদের নিকট যাই যাহারা বিনা ওজরে ঘরে নামায পড়িয়া লয় এবং তাহাদের ঘরগুলিকে জ্বালাইয়া দেই। (আবু দাউদ)

     ** হযরত আয়েশা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, মেসওয়াক করিয়া দুই রাকাত পড়া মেসওয়াক ব্যতীত সত্তর রাকাত পড়া হইতে উত্তম। (বাযযার, মাজমায়ে যাওয়ায়েদ)

     ** হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, যে ব্যক্তি পাবন্দীর সহিত ইস্তেগফার করিতে থাকে আল্লাহ তায়ালা তাহার জন্য প্রত্যেক অসুবিধায় মুক্তির পথ করিয়া দেন। প্রত্যেক দুশ্চিন্তা হইতে নাজাত দান করেন এবং তাহাকে এমন জায়গা হইতে রুজী দান করেন যেখান হইতে তাহার ধারণাও থাকে না। (আবু দাউদ)

     ** হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) ও হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) তাহারা উভয়ে এই কথার সাক্ষ্য দেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, যে জামাত আল্লাহ তায়ালার যিকিরে মশগুল হয় ফেরেশতাগণ উক্ত জামাতকে ঘিরিয়া লন, রহমত তাহাদিগকে ঢাকিয়া লয়। তাহাদের উপর সকীনা নাযিল হয় এবং আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের মজলিসে তাহাদের আলোচনা করেন। (মুসলিম)

     ** হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, যখন জান্নাতের বাগানের উপর দিয়া অতিক্রম কর তখন খুব চরিয়া লইও। সাহাবা (রাঃ) আরজ করিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, জান্নাতের বাগান কি ? এরশাদ করিলেন, যিকিরের হালকা (বা মজলিস)। (তিরমিযী)

      ** হযরত হোযাইফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করিয়াছেন, সেই যাতের কসম, যাহার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা অবশ্যই আমর বিল মারুফ নাহী আনিল মুনকার (সৎকাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ) করিতে থাক। নতুবা অতিসত্বর আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর আপন আযাব পাঠাইয়া দিবেন। অতঃপর তোমরা দোয়া করিলেও আল্লাহ তায়ালা তোমাদের দোয়া কবুল করিবেন না। (তিরমিযী)


© 2011 Bikrompur Sahittya Parishad, All Rights Reserved  | Designed & Developed by Liakot Ali Khan

স্বাধীন বাংলার রাজধানী বিক্রমপুর : একাল সেকাল


ঐতিহাসিক জনপদ বিক্রমপুর, স্বাধীন বাংলার রাজধানী বিক্রমপুর আজ ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। এক সময়ের সেই গৌরবের রাজধানী বিক্রমপুর এখন অতিতের নিরব সাক্ষী মাত্র। নির্জন ভগ্নস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে আছে। অস্তিত্বরক্ষার প্রাণান্তকর চেষ্টায় কেবল মৌনমুখের নীরব হাতছানি। রক্ষা করার কেউ নেই। এমনকি ঐতিহ্যিক অবয়বের শেষ চিহ্নটুকু রক্ষা করতে ব্যর্থ। জাতীয়ভাবে প্রতœতত্ত্ব বিভাগেরই তা রক্ষণাবেক্ষণের কথা। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়াস পদক্ষেপ নামসর্বস্ব সীমানায় অবরদ্ধ। অথচ পৃথিবীর সব দেশেই এ ব্যাপারে অন্তরনিষ্ঠ প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। কারণ, ঐতিহ্যভ্রষ্ট জাতি অবশ্যই ধ্বংসপ্রবণ জাতি। এদের পতন অনিবার্য। অতীত, ইতিহাস ও ঐতিহ্য - এই তিনের উপর একটা জাতির গতিপথ নির্মীত হয়। রবীন্দ্রনাথ সপ্রসঙ্গ বর্ণনার গুরুত্ব অনুধাবন করে বলেন, “হে অতীত তুমি ভুবনে ভুবনে কাজ করে যাও গোপনে”। এর মাধ্যমে গড়ে ওঠে ভবিষ্যত কর্মপন্থার রূপরেখা। এ প্রেক্ষিতে বিক্রমপুরের ঐতিহ্যবিলুপ্তি জাতিগত জীবনে একটা অপূরনীয় ক্ষতি। আর বিক্রমপুরবাসীর জন্য তা এক ধরণের অশনি সংকেত। প্রলয়ের শিহরিত সর্বনাশা বললেও অত্যুক্তি করা হয় না। সারা বাংলায় বিক্রমপুরের নেতৃস্থানীয় শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ধর্মনীতি, অর্থনীতি আজ স্বপ্নলোকের রোমন্থন ছাড়া কিছু নয়। বর্তমান প্রজন্ম তা কল্পনাই করতে পারছে না। কী তাদের উত্তরাধিকার ? কী তাদের কর্মপথের অন্বিষ্ট অন্বেষা ? ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। এ এলাকার মানুষ এখন স্থূল বৈষয়িক ভাবনার ঠুনকো ঐশ্বর্যের মোহে মগ্ন। মায়া মরীচিকাবেষ্টিত মিথ্যা জৌলুসের পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে। কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও নন্দনবোধের জগৎ থেকে প্রায় নির্বাসিত। এ ছাড়া বর্তমানে আরো একটা সমস্যা এর জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলা-বিভক্তির সুবাধে বর্তমানে এ অঞ্চলটি ‘মুন্সিগঞ্জ’ নামে পরিচিতি পায়। ফলে ‘বিক্রমপুর’ নামের বিলুপ্তি বিদায়ের ঘন্টাটি আবার নতুন করে বেজে ওঠে। সম্প্রতি কিছু সংগঠন এ জেলাটি মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর নামে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানিয়ে আসছে। এ দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। কারণ, অংশবিশেষ অঞ্চল মুন্সিগঞ্জের নামে নামকরণ হতে বাধা নেই। কিন্তু বিক্রমপুর শব্দটি প্রযুক্ত হলে তা আরও বেশি অর্থগাঢ় ও মর্মগাঢ় ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত হতে পারে। এর ফলে নামের মাধ্যমে কিছুটা হলেও বিক্রমপুর জনপদের ঐতিহ্য সুরক্ষিত হতে পারে।.
     খ্রিঃ পূঃ তিন হাজার বছর পূর্বের খগে¦দের ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে ‘বঙ্গ’ নামে দেশের উল্লেখ পাওয়া যায়। বৈদিক যুগ, মহাকাব্যের যুগ, পৌরণিক যুগ- এই তিন যুগেই বঙ্গ নামের দেশটি বেশ সুপরিচিত। এ ছাড়া মহাকবি ভাঘের কাব্য, অষ্টাধ্যায়ী পাণিনিতে, পাণিনির বৃত্তি, পতঞ্জলির মহাভাষ্য, বিষ্ণুপুরাণ , মৎস্যপুরাণ, হরিবংশ, ভাগবত, রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতি গ্রন্থে ‘বঙ্গ’  নামটি বারবার উল্লিখিত হয়েছে। এই ‘বঙ্গ’ দেশের প্রাচীন সীমানা সম্পর্কে ডঃ নীহাররঞ্জন রায় বাঙালীর ইতিহাস গ্রন্থে বলেন, “উত্তরে হিমালয় এবং হিমালয় হইতে নেপাল, সিকিম ও ভোটানরাজ্য; উত্তর-পূর্বদিকে ব্রহ্মপুত্র নদ উপত্যকা; উত্তর-পশ্চিম দিকে দ্বারবঙ্গ পর্যন্ত ভাগীরথীর উত্তর সমান্তরালবর্তী সমভূমি; পূর্বদিকে গারো-খাসিয়া-জয়ন্তিয়া-ত্রিপুরা-চক্রগ্রাম শৈলশ্রেনী বাহিয়া দক্ষিন সমুদ্র পর্যন্ত, পশ্চিমে রাজমহল-সাঁওতাল-পরগনা-ছোটনাগপুর-মানভূম-ধলভূম-কেওঞ্জার-ময়ূরভঞ্জের শৈলময় অরণ্যময় মালভূমি; দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই প্রকৃতিক সীমাবিধৃত ভূমিখন্ডের মধ্যেই প্রাচীন বাংলার গৌড়পুন্ড্র-বরেন্দ্রীথ-রাঢ়া-সুহ্ম-তাম্রলিপ্তি-সমতট বঙ্গ-বঙ্গাল-হরিকেশ প্রভিৃতি জনপদ”। এর মধ্যে ‘সমতট’ জনপদের মধ্যেই বিক্রমপুরের অস্তিত্ব ছিল। চৈনিক পরিব্রাজক ইউয়ানচায়েঙ্গের ভ্রমন বৃত্তান্তে এ কথার সমর্থন পাওয়া যায়। সেখানে তিনি বিক্রমপুরকে প্রাচীন সমতটের অন্তর্ভুক্ত বলে উল্লেখ করেন। বিক্রমপুর ছাড়াও সমতটের অংশ ছিল Ñ যশোহুরের কতকাংশ, ফরিদপুর, খুলনা, বাখরগঞ্জ, ঢাকা এবং ত্রিপুরা জেলা। এর মধ্যে বিক্রমপুরের সীমানা নির্ধারণ বেশ দুরূহ ব্যাপার। বিভিন্ন সময়ে এর সীমা পরিসীমা বারবার গতিপথ পরিবর্তন করছে। রাজনৈতিক উত্থান পতনের কারণে এর ভৌগলিক অবস্থানের অদল-বদল ঘটে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের মাধ্যমেও বিক্রমপুরের রূপ-রপান্তর অব্যাহত থাকে। বিশেষত হেয়াঁলি পদ্দার ভাঙাগড়ায় এই এলাকা বিভিন্নভাবে ভূপ্রকৃতি পরিবর্তন করে। প্রাসঙ্গিক বর্ণনায় যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত ‘বিক্রমপুরের ইতিহাস’ গ্রন্থে বলেন, “নদী-প্রবাহের দিন গতি পরিবর্তন হেতু বিক্রমপুরের সীমানাও পরিবর্তন ঘটিয়েছে, তারপর চন্দ্র বর্ম সেন প্রভৃতি হিন্দু ও বৌদ্ধ নৃগতিগণেল শাষণকালে পাঠান ও মোগল প্রভাবকালে চাঁদরায়, কেদাররায় প্রভৃতি বার ভূইয়ার প্রাধান্য সময়েও বিক্রমপুরের সীমা পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হইয়াছে, তারতপর ইংরেজ-রাজত্ব-কালে বিক্রমপুরের সীমা পদ্মা নদীর গতি পরিবর্তনে ও ভীষণ আক্রমনে দিন-দিনই পরিবর্তিত হইতেছে”। এ প্রসঙ্গে তিনি বিক্রমপুরের সীমনা নির্নয় করতে গিয়ে বলেন, “উত্তরে ধলেশ্বরী নদী, পূর্বসীমা মেঘনাদ বা মেঘনা, পশ্চিমসীমা পদ্মা ও চন্দ্রপ্রতাপ কতকটা এবং আরিয়ল বিলের অপর পারের দোহার, গাঞ্জিমপুর(উহা চন্দ্রপ্রতাপ ও বিক্রমপুরের সীমান্ত স্থানে অবস্থিত) প্রভৃতি স্থান; দক্ষিণ সীমা ইদিলপুর”।

     ‘বিক্রমপুর’ নামের উৎপত্তি সম্পর্কে নানারকম গল্পকথা প্রচলিত আছে। কেউ কেউ রাজা বিক্রমাদিত্যের প্রতিষ্ঠিত রাজ্য থেকেই বিক্রমপুরের উদ্ভব বলে মনে করেন। ‘বিপ্রকুলকল্পলতিকা’ গ্রন্থ অনুসারে সেনবংশীয় বংশধর বিক্রমসেনই বিক্রমপুরের স্থপতি বলে অনুমিত হয়। সংস্কৃত বৌদ্ধগ্রন্থ ‘বিক্রমনীপুর’ থেকেও বিক্রমপুর নামের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। “বিক্রমপুরী-বিহার হইতে বিক্রমপুরের নাম হইয়াছে। তেঙ্গুরের মতে বিক্রমপুরী-বিহার বঙ্গদেশে (মগধের পশ্চিমে) অবস্থিত ছিল। নামের মিল দেখিয়া মনে হয় যে, উহা পূর্ববঙ্গের (ঢাকা বিভাগ) বিক্রমপুর নামক স্থানে অবস্থিত ছিল। এবং জায়গাটির নাম বিহারটির নাম দুই-ই ধর্মপালের বিক্রমশিলার অপর নাম হইতে হইয়াছিল। এই ধর্মপালই বাংলাদেশের একমাত্র রাজা, যাহার বিক্রমশীলদেব নাম ছিল এবং তিনি যে পূর্ববঙ্গের উপর আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন, এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই ( Indian Culture Buddhist Vihars of Bengal-vol 1 No-2 Nalininath Das Gupta, page -230)। এসব মতামতের ভিত্তিতে ‘বিক্রমপুর’ নামের উদ্ভব সম্পর্কে অনেকটাই অবগত হওয়া যায়। তবে বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ যোগে-মোটামুটিভাবে নবম শতাব্দী থেকেই শ্রীবিক্রমপুর নামের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। এরপর থেকেই শ্রীচন্দ্রদেবের তাম্রশাসন, শ্যামলবর্মার তাম্রশাসন, সেনরাজাদের তাম্রশাসন প্রভৃতির মাধ্যমে বিক্রমপুরের অস্তিত ইতিহাস লিপিবদ্ধ হতে থাকে।

     প্রাচীন বাংলার রাজধানী হিসেবে বিক্রমপুরের অস্তিত্ব ছিল দীর্ঘদিন। শত-শত বছরের ইতিহাসমৃদ্ধ এই জনপদের কীর্তিগাথার পরিধি ব্যাপক। এসম্পর্কিত আলোচনা গবেষণা সাপেক্ষ ও বেশ আয়াসসাধ্য ব্যাপার। এর জন্য বিস্তৃত পটভূমিই অধিকতর উপযোগী। স্বল্প পরিসরে তা উপস্থাপন করা দুঃসাধ্য। অনেকটা অসম্ভবও বটে। তথাপি অতিশয় সংক্ষিপ্ত ভাবে রাজধানী বিক্রমপুরের কিছু পরিচিতি তুলে ধরা হলো।
    
     মূলত রামপাল ও তার চারিদিককার বিস্তৃত এলাকা নিয়ে শ্রীবিক্রমপুর-নামক রাজধানী গড়ে ওঠে। কেউ কেউ বলেন, পালবংশীয় রাজা রামপালের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। আবার এ ব্যাপারে ভিন্ন মতালম্বী কথাবার্তাও প্রচলিত রয়েছে। এই রাজধানীরই অংশবিশেষ হচ্ছে- সুবাসপুর (সুখবাসপুর), বজ্রযোগিনী, আটপাড়া, সুয়াপাড়া, নাহাপাড়া, রঘুরামপুর, শঙ্করবান্দ, মীরকাদিম, পানাম, পঞ্চসার, চুড়াইন, কেওয়ার, সিপাহীপাড়া, দেওসার, সোনারং, টঙ্গীবাড়ি প্রভৃতি। এখানে চন্দ্র, বর্ম ও সেন-বংশীয় রাজারা দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছেন। দশম শতক থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত চন্দ্রবংশীয় শাসকবর্গ অধিষ্ঠিত ছিলেন। পরে বর্মরাজগণ এখানে বসেই বঙ্গরাজ্যে শাসনদন্ড পরিচালনা করতেন। পরবর্তীতে বিজয়সেনের মাধ্যমে ‘বিক্রমপুর’ সেনরাজাদের হস্তগত হয়। এরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিজয়সেনের পুত্র বল্লালসেন, বল্লালসেনের পুত্র লক্ষণসেন, লক্ষণসেনের পুত্র বিশ্বরূপসেন, কেশবসেন প্রমুখ নৃপতি অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই এলাকায় এখনও সেই হারিয়ে যাওয়া রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ দৃশ্যগোচর হয়।

     এখানে রাজা বল্লালসেনের আবাসিক অট্টালিকার অস্বিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। বাড়ির চর্তুদিকে পরিবেষ্টিত ২০০ ফিট প্রশস্ত পরিখার অস্তিত্ব এখনও বিদ্যমান। লোকজন এখনও এটিকে বল্লালবাড়ি হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। এই বাড়ির দক্ষিণ পাশে একটি গজারি বৃক্ষ অবস্থিত। লোকে এটিকে বল্লালের হস্তিবন্ধন-স্তম্ভ বলে সম্মান প্রর্দশন করেন। এখনও অনেক পূন্যার্থী সিঁদুর সন্দেশ দিয়ে পূজা নিবেদন করে থাকেন। বল্লালবাড়ির মাঝখানে একটি মিঠাপুকুর রয়েছে। এর পাশেই আছে অগ্নিকুন্ড। কথিত আছে, বল্লালসেন বাবা আদম ফকিরের সাথে যুদ্ধে নিহত হন। এ সংবাদ পেয়ে তাঁর অন্তপুরবাসীগণ এই অগ্নিকুন্ডেই আত্মবির্সজন দেন। অগ্নিকুন্ডের যাবতীয় চিতাভস্ম মিঠাপুকুরে জলাঞ্জলি দেয়া হতো। বল্লালবাড়ি থেকে প্রায় আধমাইল দূরে বাবা আদম ফকিরের মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদের পাশেই রয়েছে তাঁর কবর। মসজিদের প্রস্তরফলকের মাধ্যমে এর নির্মানকাল ১৪৮৩ খ্রিঃ বলে জানা যায়। বাবা আদমের মসজিদ বরাবর দক্ষিণে একটি দীঘি অবস্থিত। এটি কোদালধোয়ার দীঘি হিসেবে খ্যাত। প্রচলিত আছে, বল্লালসেনের দীঘি থননকার্যে নিয়োজিত শ্রমিক প্রতিদিন এখানে কোদাল ধুয়ে নিত! কর্মশেষে প্রতিদিন তারা এখানে এককোদাল মাটি কেটে কোদাল ধুয়ে ফেলত। এক কোদাল করে মাটি কাটার দরুণ ক্রমান্বয়ে একটা বিশাল দীঘির সৃষ্টি হয়। কালক্রমে এটি কোদাল ধোয়ার দীঘি হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। এ ছাড়াও রামপালের দীঘি বা বল্লালসেনের দীঘি ছিল বিক্রমপুরের অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান। এই দীঘির দৈর্ঘ ২২০০ ফিট ও প্রস্থ ৮৪০ ফিট। এটি এখনও বিদ্যমান রয়েছে। রাজা বল্লালসেন এই দীঘিটি খনন করিয়েছিলেন। এই দীঘি সম্পর্কে অনেক চমকপ্রদ গল্প কাহিনী প্রচলিত আছে। ১৮৬৭ খিঃ প্রসন্নচন্দ্র গুহ রামপালের বিবরণ প্রসঙ্গে বলেন, “কথিত আছে, মহারাজা বল্লালসেন এরূপ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন যে, তাঁহার জননী একাদিক্রমে যতদূর পদব্রজে যাইতে পারিবেন রাজা বল্লাল ততদূর দীর্ঘ এক দীঘিকা খনন করাইয়া দিবেন। তদনুসারে তাঁহার মাতা এক দিবস বৈকালে বাহির বাটীর দক্ষিণ হইতে ক্রমাগত দক্ষিণাভিমুখে চলিয়া যাইতে থাকিলেন। তিনি অধিকদূর গমন করিলে পর বল্লালসেনের মনে এই ভাবনা উপস্থিত হইল যে, তাঁহার মাতা অনেক দূর অতিক্রম করিয়াছেন। আরও গমন করিলে তিনি অত বড় দীঘিকা অত্যল্প সময়ের মধ্যে খনন করিতে পারিবেন না। রাজার ইঙ্গিতানুসারে একজন অনুচর তাঁহার জননীর চরণে অলক্ত-চিহ্নিত করিয়া বলিল, ‘ঠাকুরাণি! আপনার চরণে শোণিত চিহ্ন দেখিতে পাইতেছি, এ শোণিত চিহ্ন কিসের ? একথা শুনিয়া বল্লালজননী চমকিত ভাবে ফিরিয়া চাওয়া মাত্রই  সেই স্থানে এক খোটা গাড়িয়া চিহ্নিত করতঃ দীঘি খনন-কার্য আরম্ভ হইল’।  এখানে পাশাপাশি আরও অনেকগুলো দীঘি দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি হরিশ্চন্দ্রের দীঘি বলে পরিচিতি লাভ করে। রামপালের দক্ষিণে সুখবাসপুর গ্রামে বহু পুরাকীর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। মনসাবাড়ির দীঘি থেকে এক প্রকান্ত বিষ্ণুমূর্তি পাওয়া যায়। যা আব্দুল্লাপুরে বৈষ্ণবদের আখড়ায় রক্ষিত আছে। এরকম অজ¯্র স্মৃতিস্তম্ভ এখনও রামপালের যত্রতত্র থেকে আবিষ্কার করা সম্ভব। কিন্তু যথাযথ উদ্যোগের অভাবে এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দ্রুততার সাথে নিঃশেষিত হচ্ছে। কিন্তু কালের বৈরী বাস্তবতা উপেক্ষা করে এখন কিছু নিদর্শন টিকে আছে। যেমন, কীর্তিনাশা পদ্মা, কালীগঙ্গা নদী, তালতলার প্রসিদ্ধ খাল, মীরকাদিমের খাল, হলদিয়ার খাল, ধলেশ্বরী নদী, আড়িয়ল বিল, কদম বিল, হাসাঁড়ার বিল, ঐতিহ্যবাহী পানের বরোজ প্রভৃতি।

     বিক্রমপুরের এই রাজোচিত পরিবেশই কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও শিল্প সাহিত্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। সারা বাংলায় এর অপ্রতিহত প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। এমনকি বাংলার বাইরেও এই সাংস্কৃতিক সভ্যতার ধারা বিস্তার লাভ করে। এরই সুযোগ্য উত্তরপুরুষরূপে বহু জ্ঞানী-গুনী, আচার্য-পন্ডিত এখানে আর্বিভূত হন। এদের মধ্যে প্রথমেই বৌদ্ধ পন্ডিত ধর্ম প্রচারক অতীশ দীপঙ্করের নাম স্মরণ করা যায়। তিনি আনুমানিক ৯৮০ খ্রিঃ কিংবা ৯৮২-৮৩ খ্রিঃ বিক্রমপুর বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। অতীশ দীপঙ্কর নয়পালদেবের রাজত্বকালে নালন্দা মহাবিহারের সঙ্ঘস্থবির নিযুক্ত হন। এবং তিব্বতরাজ্যের আমন্ত্রণে সেখানে তিনি বিপুলভাবে সংবর্ধিত হয়েছেন। অতঃপর রাজার মাধ্যমে অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে জাতীয় ধর্মগুরুরূপে বিবেচিত হতে থাকেন। অতীশ দীপঙ্কর প্রচুর গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে - বোধিপথপ্রদীপ, চর্য্যা সংগ্রহপ্রদীপ, মধ্যমোপদেশ, সংগ্রহগর্ভ, মহাযান পথসাধন, বর্ণসংগ্রহ, দশ কুশল কর্মোপদেশ, বর্ণ বিভঙ্গ প্রভৃতি। এ পর্যায়ে পরবর্তীতে আরো অনেক বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিপুরুষের আর্বিভাব ঘটে। যাদের বিশ্বপ্রতিম প্রতিভা-প্রতিপত্তি আজ সর্বজনবিদিত। এঁেদর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন - স্যার জগদীশচন্দ্র বসু, সৈয়দ এমদাদ আলী, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, ব্রজেন দাস, সরোজিনী নাইডু প্রমুখ।

     জগদীশচন্দ্র বসু শ্রীনগর থানার রাঢ়িখাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিতি পান। জগদীশচন্দ্র বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বিভিন্নভাবে বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করেছেন। জগদীশচন্দ্র গাছের মধ্যে জীবনের অস্তিত্বজ্ঞাপক আবিষ্কারের জন্য বিশ্বপরিচিতি লাভ করেন। তাঁর এই অসামান্য কৃতিত্ত্বের জন্য রবীন্দ্রনাথ রীতিমত বিস্ময়বিষ্ট হন। এবং কবিতার ভাষায় বন্ধু জগদীশজন্দ্রকে উৎসাহ প্রদান করেন। ‘জগদীশচন্দ্র’ শিরোনামযুক্ত কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বলেন, “যেদিন ধরনী ছিল ব্যাথাহীন বানীহীন মরু/ প্রাণের আনন্দ নিয়ে, শঙ্কা নিয়ে, দুঃখ নিয়ে তরু/ দেখা দিল দারুণ নির্জনে কত যুগ-যুগান্তরে/ কান পেতে ছিল স্তধ্ব মানুষের পদশব্দ তরে/ নিবিড় গহণতলে ... হে তপস্বী, তুমি একমনা/ নিঃশব্দেরে বাক্য দিলে; অরণ্যের অন্তরবেদনা/ শুনেছ একান্তে বসিংমূক জীবনের যে ক্রন্দন/ ধরনীর মাতৃবক্ষে নিরন্তর জাগানো স্পন্দন/ ... তাহার রহস্য তব কাছে/ বিচিত্র অক্ষররূপে সহসা প্রকাশে লভিয়াছে”। এ ছাড়া ‘জগদীশচন্দ্র বসু’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বিশ্ব বিজ্ঞানসভায় বিজয়মাল্য দিয়ে বরণ করে নেন। তিনি বলেন, “বিজ্ঞানলক্ষ্মীর প্রিয় পশ্চিমমন্দিরে/ দূর সিন্ধুতীরে / হে বন্ধু, গিয়েছ তমি! জয়মাল্য খানি / সেথা হতে আনি / দীনহীনা জননীর লজ্জানত শিরে / পরায়েছ ধীরে”।
     মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা কথা সাহিত্যে একটি অবিস্মরনীয় নাম। তিনি সিরাজদিখান থানার মালবদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ৩৬টি উপন্যাস ১৭টি গল্পসংকলনে প্রায় ১৭৭টি ছোটগল্প লিখেছেন। এর মধ্যে পদ্মানদীর মাঝি, পুতুলনাচের ইতিকথা, সহরতলী,অহিংসা, হলুদ নদী সবুজ বন, দিবারাত্রির কাব্য প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসটি নোবেলপ্রাপ্তির উপযোগী বলে মনে করা হয়। সমালোচকগণ এটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম দশটি উপন্যাসের একটি বলে মতামত দিয়েছেন। ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসে মানিক বিক্রমপুরকে পটভূমি হিসেবে গ্রহণ করেন। এখানে লৌহজং থানার গাওদিয়া গ্রামের কাহিনী অর্ন্তভুক্ত করা হয়। উপন্যাসটিতে শশী কুসুমের প্রণয়কাহিনী গাওদিয়া গ্রামকে অবলম্বন করে গড়ে ওঠে। তাদের এই ক্লাসিক্যাল মানবসম্পর্ক শিল্পময় মর্যাদায় উত্তীর্ণ হয়। এ সুবাধে বিক্রমপুরের কিছু অংশবিশেষ মানুষের চিরায়ত নন্দনবোধের অংশ হয়ে রইল।

     সৈয়দ এমদাদ আলী টঙ্গীবাড়ি থানার ধামপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। হিন্দু সাহিত্যিকদের একছত্র দাপটের মুখে এমদাদ আলী কিছু বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ঐতিহ্যভ্রষ্ট অন্ধকারে নিমজ্জিত মুসলিম জাতিকে তিনি আলোকিত পথের সন্ধান দেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে - কাব্য-ডালি, পত্রোপন্যাস-‘হাফেজা’ ও জীবনকাহিনী - ‘রাবেয়া’। এ ছাড়া তিনি ‘নবনূর’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। এই পত্রিকা পকিাশের মাধ্যমে তিনি মুসলমানদের অভিভাবকরূপে আর্বিভূত হন। অনেকে এই পত্রিকাকে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সাথে তুলনা করে থাকেন।

     এ পর্যায়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আলোচনাসূত্রে প্রবন্ধটির সমাপ্তি নির্দেশ করতে চাই। কারণ, তাঁর বক্তব্য অভিবাষণগুলো আলোচ্য বিষয়ের সাথে গভীরভাবে সাজুয্যপূর্ণ। প্রবন্ধের উদ্দেশ্য- অন্বেষা ও বিক্রমপুরের স্বরূপ-প্রকৃতি অনেকটাই এসব ভাষণে কথা কয়ে ওঠে। যা বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি অনশ্বর অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আর বিক্রমপুরবাসীকে তা রেনেসাঁর আলোয় আলোকিত পথের সন্ধান দিতে সক্ষম। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ বিক্রমপুর সম্মিলনীর দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনের সভাপতি রূপে ১৩২৩ সালের পৌষ মাসে ডোমসার গ্রামে যে অভিভাষণ পাঠ করেন - তার অংশবিশেষ এখানে উদ্ধৃত হলো। তিনি বলেন, “যে দেশেই থাকি না কেন, যত বিদেশই ঘুরিয়া বেড়াই না কেন, যখনি মনে করি আমি বিক্রমপুরবাসী, তখনই প্রাণে প্রাণে একটা গর্ব অনুভব করি। বিক্রমপুর যে আমার শরীরের শিরায় শিরায় আমার অস্থিমজ্জাগত বিক্রমপুরের শত শত কাহিনী যে আমাদের প্রত্যেকের জীবনের মধ্যে জড়াইয়া গিয়াছে। এই যে ভাব, যাহা সকল ভাব, সকল ভাবনা, সকল চিন্তা, সকল সাধনার মধ্যে আপনাকে জানাইয়া দেয়, এই যে স্মৃতি, যাহা ফুলের সঙ্গে জড়ান গন্ধের মক আমাদের জীরনে জড়াইয়া আছে; এই ভাব ও এই স্মৃতি সর্বদা জাগ্রত দেবতার মত আমাদের হৃদয়-মন্দিরে জাগাইয়া রাখিতে হইবে।.........................


     যেমন সমস্ত বাঙালা দেশের একটা চিরন্তন বানী আছে, আমাদের বিক্রমপুরেরও সেইরূপ একটা বিশিষ্ট বানী আছে। আমরা কান পাতিয়া তাহা শুনিতে চাই। সে বানী শুধু আমাদের জন্যে। কর্মক্ষেত্রে সে বানীকে সার্থক করিতে হইলে সে বানী বুঝা চাই - শুনা চাই, তাহাকে প্রাণে প্রাণে উপলধ্বি করা চাই।



মুহাম্মদ জমির হোসেন
প্রভাষকঃ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
উত্তরা, ঢাকা.


© 2011 Bikrompur Sahittya Parishad, All Rights Reserved  | Designed & Developed by Liakot Ali Khan

সম্পাদকের কথা

প্রিয় পাঠক,
     আস্সালামুআলাইকুম, শুভেচ্ছা নিন। আশা করি সকলে ভাল আছেন।
     সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গণের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা জনপদের নাম ‘বিক্রমপুর’। এরই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যে “বিক্রমপুর সাহিত্য পরিষদ” চেষ্টা করে যাচ্ছে। সাহিত্যকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে “বিক্রমপুর সাহিত্য পরিষদ” এর পক্ষ হতে এ বছরেও সাহিত্য পত্রিকা “আবহমান” প্রকাশ করতে যাচ্ছি। “আবহমান” তার প্রকাশনার ছয় বছর অতিক্রম করেছে। এবারের প্রকাশনায় প্রথমেই রয়েছে বিক্রমপুরের ইতিহাসের ওপর মুহাম্মদ জমির হোসেন স্যারের একটি প্রবন্ধ। এতে তুলে ধরা হয়েছে বিক্রমপুরের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য, জ্ঞানী-গুনী ও আচার্য-পন্ডিতদের। মানুষের জীবনের সবচেয়ে আলোড়নময়, মনোরম এবং স্মৃতিবহুল অধ্যায় তার শৈশব। শৈশব, বেড়ে ওঠার ধরন, তার পরিবেশ যেমন মানুষকে নির্মান করে, তার ভিত্তি রচনা করে তেমনি অনেক সৃষ্টিশীল মানুষ আবার সাহিত্যে নিজের মত করে তার শৈশবকে নির্মান করে নেন। আর ছেলেবেলার গল্প বলতে পারলে তা শুনতে ভালই লাগে। তেমনি এক ছেলেবেলার গল্প লিখেছেন ইমদাদুল হক মিলন। রয়েছে জগদীশচন্দ্র বসুর জীবনির ওপর একটি প্রবন্ধের কিছু অংশ। আরো রয়েছে কয়েকটি ছোট গল্প, কবিতা, হাদীস এবং আমাদের বিশেষ আয়োজন কুইজ।

     জানিনা এবারের প্রকাশনা কতটুকু সুন্দর ও সাবলীল করতে পেরেছি। তবে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি সুন্দর ও সাবলীল করে আপনাদের মাঝে উপস্থাপন করতে। আশা করছি ইনশাআল্লাহ আগামীতে আরো সুন্দর ভাবে বিক্রমপুরকে আপনাদের মাঝে উপস্থাপন করতে পারবো।

    অবশেষে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি লেখক/লেখিকা, পাঠক/পাঠিকা ও পৃষ্ঠপোষকদের কাছে যারা ভালবাসা এবং সর্বাত্তোক সহযোগীতার মাধ্যমে এ প্রকাশনাকে সুন্দর করে তুলেছেন।
সবাই ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।
আল্লাহ হাফেজ।



সম্পাদক
রাসেল আহমেদ

মানুষ ও নক্ষত্রের গল্প - নুরুন্নাহার নার্গিস

ফোন কলটি ঠিক মাঝরাতে আসে। ক’দিন থেকেই এমনটি হচ্ছে। অপর প্রান্ত নীরবে নামিয়ে রাখে রিসিভার। ‘কল’-টি দেশের বাহির থেকে আসে। তুলি ভাবে, ছোটদা ছাড়া তো বাইরে কেউ থাকে না ওর; তাছাড়া এত রাতে ছোটদা কেনই বা এমন করবে। কিছুই ভেবে পায় না সে। প্রতিদিনের মত দুপুরের খাবারের পরে আজও বারান্দায় ঈজি চেয়ারটায় গা এলিয়ে দেয় তুলি। দৈনিকের পাতাটা পরে থাকে বুকের পরে। ছোটদা ছাড়া কারো সাথেই তেমন একটা যোগাযোগ নেই। সুদূর প্রবাস থেকে সে-ই শুধু যোগসূত্র রেখেছে কিছুটা।

     “মানুষের জীবন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত” বইয়ের পাতায় পড়া কথাটি সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে অনুভব করে, নিসঃঙ্গ পথের যাত্রী তুলি। একমাত্র কাজের জায়গাটুকু ছাড়া চারপাশে তার কোন লোকালয় নেই বলতে গেলে। ক্রিং ক্রিং ফোনটা এসময় বেজে ওঠে। রিসিভার উঠাতেই ভেসে আসে ছোটদার কন্ঠ। Ñ ‘তুলি, সায়নকে মনে আছে তোর ? সেই যে ছেলে বেলায় ঢিল ছুঁড়ে কপাল ফাটিয়ে দিয়েছিলি ? Ñ হ্যাঁ রে, সেই সায়নই এখন টেক্সাস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক  ডঃ সায়ন আহ্মেদ, আর ও তোকে এখনও বেশ মনে রেখেছে’। একটু ছেলে মানুষী সুর ছোটদার কন্ঠে।

     ফোনটা ছেড়ে স্ব-স্থানে ফিরে আসে তুলি। এবার ওর কাছে পরিস্কার হয়ে যায় মাঝ-রাতের ‘কল’ রহস্য। চোখের পাতা বন্ধ করে স্মৃতির তিমিরে ডুবে যায় সে। মুক্তি যুদ্ধে শহীদ হওয়া স্কুল মাষ্টারের ছেলে সায়ন। গ্রামের বাড়ী থেকে মেধাবী সায়ন-কে বাবা-ই নিয়ে এসেছিলেন আশ্রয় দিতে। সায়ন ছিল মুখ-চোরা আর বেশ নিরীহ স্বভাবের। আসলে অন্যের আশ্রিতদের হয়তো এমনটিই হতে হয়। তুলির খেলার সাথী ছিল সে, তবে বছর দুয়েকের বড় হবে তার চেয়ে।

     একদিন অপ্রত্যাশিতভাবেই ঘটে গেল ঘটনাটি। সাত চাড়া খেলতে গিয়ে একটু রাগের ঝোঁকেই চারা ছুঁড়ে ওর কপাল ফাটিয়ে দিয়েছিল তুলি। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, খুব ঘাবড়ে যায় সে। ছেলেটা যদি আবার মরে-টরে যায় ! তাছাড়া বাবা ছিলেন ডিফেন্সের লোক, কড়া মেজাজী, আর তার শাস্তিও ছিল খুব কঠোর। বাবার শাস্তির ভয়ে খুবই কেঁদেছিল সে। কিন্তু সায়নই সে যাত্রায় বাঁচিয়ে দিয়েছিল তাকে। বাবা-কে বলেছিল, হোঁচট খেয়ে পরে যাবার কথা। সায়নের মহানুভবতায় প্রবল হয়েছিল তুলির কান্না। হয়তো চোখের পানিতেই কৃতজ্ঞতা জানাতে চেয়েছিল ছেলেটিকে। কিন্তু ওর ডিফেন্সিভ বাবা ওর কান্নার অন্যরকম অর্থ করেছিলেন। মাকে আড়ালে ডেকে দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিলেন Ñ “মেয়েকে সামলাও। আর ও নিমকহারাম-টা, আমারই খেয়ে আমারই ঘরে সিদঁ কাটার চেষ্টা করছে”।

     এরপর কিছুটা সুস্থ হতেই বাবার আশ্রয় হারাতে হয়েছিল সায়নকে। একটা মিথ্যে সন্দেহের অপবাদ নিয়ে চলে গিয়েছিল সে। তুলি ওর জন্য খুব কষ্ট পেয়েছিল অনেক দিন। তারপর এক সময় ভুলেই গিয়েছিল শৈশব-কৈশোরের খেলার সাথীকে।

     ছোটদার শেষ কথাটি অনুরাণিত হয় আবার Ñ সায়ন এখনও অনেকটাই মনে রেখেছে তাকে। কিন্তু এটা কি করে সম্ভব ! জীবনের এতটা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এ-ত কাল পরে .............এ ও কি হয় ? কিন্তু কৈ সে তো মনে রাখেনি তাকে ?

     তবু ভালো, একজন কেউ বিস্মরণের ওপার থেকে মনে রেখেছে তাকে Ñ ভাবতেই একটু সূক্ষ্ম ভাললাগা অনুভুতি ছড়িয়ে পড়ে শিরা-উপশিরায়। ছোট একটু দীর্ঘ-শ্বাস বেরিয়ে আসে। সময় তার প্রেক্ষাপট বদ্লেছে। প্রবল প্রতাপশালী বাবা আজ নেই ; এক সময়ের আশ্রয়হারা সায়ন এখন টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আর সে নিজে ? জীবনের এক মস্ত বাঁক ঘুরে আজ এক নিরেট রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ভূ-গোল এর সেই সংজ্ঞাটি মনে পড়ে আবার ‘পৃথিবী গোল’। তাই হয়তো এতকাল পরে ছোটদার সাথে দেখা সায়নের, আর সেই সূত্রেই ....................।
তুলির অনুমানই ঠিক। ফোন কলটি সুদূর টেক্সাস থেকেই। এরপর কথা হয় দু’জনার প্রায়ই।

     একদিন ওর প্রশ্নের জবাবে সায়ন জানায়, ওর বা’কপালের ক্ষত চিহ্নটি কিছুই ভুলতে দেয়নি ওকে ; প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঐ চিহ্নটির পাশে একটি কান্না ভেজা মুখ সে আজও দেখতে পায়। স্তম্ভিত হয় তুলি। হায় অদৃষ্ট ! বাবার মত একই ভুল সায়নও যে করে বসে আছে। মিস্ইন্টারপ্রিটেশন। অস্ফুটেই শব্দটি বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে। ভুল ; হ্যাঁ একটা ভুল ধারনাকেই এতটা মূল্য দিয়ে বসে আছে মানুষটি। বিস্ময়ের সীমা থাকে না তার। আর অজান্তেই একটু সহানুভুতিও জাগে মনে Ñ বেচারা। কি ভীষন ভাবেইনা প্রতারিত হয়েছে। নিজের বাবার ভুলটি ভাঙ্গাতে পারেনি সেদিন ; কিন্তু সায়েনের ভুলটি কি ভাঙ্গাতে পারবে সে ? তুলি জানে মানুষের বিশ্বাস ভাঙ্গাতে নেই, তবু একদিন ওকে শুধায় Ñ ‘বিয়ে করলে না কেন’ ? ‘তুমি ও তো করোনি’ তাৎক্ষণিক জবাব দিয়েছিল সায়ন’। থমকে যায় তুলি। মনে মনে ভাবে আবারও তুমি ভুল করলে সায়ন ? জীবনের ভীষন অমসৃন পথে চলা একজন পুরুষ মানুষ যে ভেতরে ভেতরে এতটাই ইমোশনাল হতে পারে বিশ্বাস করা যায় না সত্যিই।

     আর একদিন সায়ন বলে Ñ তুলি, তোমার সাথে আর কখনও যোগাযোগ হবে ভাবিনি। কিন্তু মনে হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা মানুষের কিছু একটা চাওয়া সত্যি পূর্ণ করেন। তুলি নীরস কন্ঠে জবাব দেয় Ñ তোমার চাওয়া বড্ড সামান্য, বড্ড সাধারন।
Ñসাধারন কিনা জানি না, তবে পাওয়াটা কিন্তু অসাধারন।
Ñসেটা কেমন ?
Ñএই যে তোমায় খুঁজে পেলাম।
Ñতুমি এখনও বড্ড ছেলে মানুষই রয়ে গেছ সায়ন।

     কথা প্রসঙ্গেই তুলি বুঝতে পারে তার বাবার সেই কঠিন সিদ্ধান্তটাই সায়নকে পথ দেখিয়েছিল। আর তাঁর সে মিথ্যে সন্দেহটা প্রথমে মিথ্যে হলে ও পরে একটু একটু করে সেটাই ওর মনে জায়গা করে নেয়। অর্থাৎ তুলির অতি সতর্ক বাবা অজান্তেই একটা নিষিদ্ধতার আকর্ষণ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন সায়নের মনে। আর সেটাকেই সযতনে লালন করে গেছে সে। তুলি ভাবে বাবা হয়তো ভুলে গিয়েছিলেনÑ নিয়তীকে খন্ডাবার বিধান মানুষের হাতে নেই।

     এমনিতেই রাত জাগার অভ্যেস তুলির। কিন্তু আজ-কাল ঘুমটা আরো কমে গেছে। তাই ঘুম চটে গেলে বারান্দায় ওর প্রিয় ঈজি চেয়ারটায় এসে গা এলিয়ে দেয় সে। রাতের আকাশের নক্ষত্রগুলো তখন ওর রাত-জাগা সাথী হয়। ছেলেবেলায় দাদীজানের কাছে শুনা সপ্তর্ষি-মন্ডল আর কালপুরুষের গল্পটা বড্ড জীবন্ত হয়ে উঠে। দাদীজান বলতেন ঐ সপ্ততারা ছিল সাতবোন। সর্ব কনিষ্ঠার প্রেমে পড়ে এক কালজয়ী যোদ্ধা। কিন্তু বড় সহোদরাদের রেখে কনিষ্ঠার পরিনয় শোভনীয় নয়; তাই বিধাতার বর পেয়ে সাত-বোন ‘তারা’ হয়ে এক সাথে অবস্থান করে আকাশে। এদিকে প্রেমিক যোদ্ধা ও বর প্রার্থনা করে ¯্রষ্টার। মঞ্জুর হয় প্রার্থনা ; নক্ষত্ররূপী কালপুরুষ হয়ে সে ও অবস্থান নেয় আকাশে। দাদীজান নক্ষত্ররূপী কালপুরুষের অবস্থান বুঝিয়ে দিয়ে আরো বলতেন Ñ যোজন যোজন দূরত্ব অতিক্রম করে যেদিন সে তার প্রেমিকার কাছে পৌঁছে যাবে সেদিনই মহা-প্রলয় ঘটবে এ পৃথিবীতে। গল্প শুনে ভয়ে দু’চোখ বুজে আসতো তুলির, মনে মনে সেও প্রার্থনা করতো কালপুরুষ যেন কোনদিনই তার গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারে। দাদীজানও আজ নেই; কিন্তু তার গল্প আছে। আর আছে কালপুরুষের অভিযান। সহসাই রাতজাগা পাখী ডেকে উঠে, আত্মস্থ হয় তুলি। বুঝি বা শেষ হয়ে এল রাত, ফিরে আসে শয্যায়। এভাবেই ভোর নেমে আসে, আবার একটি দিনের শুরু হয় তুলির জীবনে। আর বৈচিত্রহীন জীবনের এই অভিযাত্রায় কিছুটা বৈচিত্র নিয়ে আসে যেন নীশিথের ডাক। নিজেরই অজান্তে একটু প্রতিক্ষার অনুভূতি যেন তীক্ষè হয়। তাই নিজেকে শুধায় Ñ ‘কেন পান্থ এ চঞ্চলতা’।

     সায়নের সাথে তার একাকীত্বের মিল রয়েছে ; মিল রয়েছে প্রফেশনেরও। কিন্তু এক মস্ত অ-মিল ও যে রয়েছে তাদের মাঝে। সায়ন এতকাল ধরে তার স্মৃতির মন্দিরকে প্রানের আলোয় উদ্ভাসিত করে রেখেছে ; আর তার নিজের সন্ধ্যা প্রদীপই জ্বলেনি। সায়ন নিজে থেকেই বলেছিল তার গদ্যময় জীবনের  পথচলা মরু-পথিকের গল্প। তুলি বুঝতে পারে, একটি সূতো-ছেঁড়া ঘুড়ির মতই সায়ন একদিন আটলান্টিকের ওপারে গিয়ে পড়েছিল। যান্ত্রিক সভ্যতার স্বাচ্ছন্দময় মেকীর জগতে সবই আছে, কিন্তু কবিতার ¯িœগ্ধতার এক ঝলক ফলগুধারা বড্ড দূর্লভ সেখানে, যা মানুষের আত্মিক প্রশান্তি বয়ে আনে। প্রানের দাবী তো কৃত্তিমতা দিয়ে পূরন করা যায় না।

     আসলে পৃথিবীর দুই প্রান্তে বসে দু’জন নিঃসঙ্গ মানুষ পুরনো স্মৃতির সূক্ষ্ম রেশ ধরে এক অভিনব সর্ম্পকের আবহ সৃষ্টি করে চলছে। আচ্ছা, এ সর্ম্পক কি বন্ধুত্বের, না বিশ্বাসের ? না ভালবাসার ? ‘ভালবাসা’ শব্দটি মনে হতেই বড্ড হাসি পায় তার। ছেলেবেলায় এক সহপাঠি একদিন ভালবাসার কথা বলতে এলে, ভীষন জোরে ওর গালে একটি চড় কষে দিয়েছিল তুলি। সেদিন চড় খেয়ে সেই যে ভালবাসা পালিয়ে গেল, আর কখনো ওর মুখোমুখি হয়নি। আচ্ছা, বিষুব রেখা থেকে দ্রাঘিমার শেষ সীমা জুড়েই কি ভালবাসার বীণা বাজে। কি জানি, হয়তো বাজে। দেয়াল ঘড়িটা রাত দুটোর সংকেত জানিয়ে দিল। ধীরে ধীরে শয্যায় এসে বসে তুলি। নাহ্ আজও ঘুমটা চটে গেছে। এ সময় আসে নীশিথের ডাক। রিসিভার উঠায় সে Ñ ভেসে আসে সায়নের ধীর-স্থির অকম্পিত কন্ঠস্বর “তুলি, আমি আমার মাটির কাছে ফিরে যেতে চাই। শেকড় আমায় আজো টানে, আমি ....... আমি সত্যি ফিরতে চাই, তুলি।” ওর কথা শুনে ভীষণ  আঁৎকে উঠে তুলি প্রথমটায়, তারপর অত্যন্ত স্বাভাবিক আর র্নিলিপ্ত কন্ঠে বলে Ñ “সায়ন, পথ চলতে গিয়ে পেছন ফিরতে নেই ; ওতে পথ হারাবার ভয় থাকে।”

     এরপর বারান্দায় এসে ঈজি চেয়ারটায় গা এলিয়ে দেয় সে, হঠাৎ এক ঝলক ক্লান্তি এসে আচ্ছন্ন করে ওর শরীর মনকে। দুরে মেঘ-মুক্ত আকাশের গায়ে নক্ষত্রের সমরোহ্। ওর উদাস করা দৃষ্টি সীমানায় জীবন্ত হয়ে উঠে নক্ষত্ররূপী কালপুরুষের অন্তহীন অভিসার।

নুরুন্নাহার নার্গিস
প্রভাষক, ইংরেজী বিভাগ।
লৌহজং ডিগ্রি কলেজ।

© 2011 Bikrompur Sahittya Parishad, All Rights Reserved  | Designed & Developed by Liakot Ali Khan

ভূত - রাসেল আহমেদ



১.

রাত তখন প্রায় আটটা,
     করিম মিয়া বাজার করে বাড়ি ফিরছেন, তার এক হাতে চটের ব্যাগ অন্য হাতে তেলের বোতল। ব্যাগের মধ্যে চাল, ডাল, লবন ইত্যাদি। চারিদিক নিরব হয়ে গেছে, অন্ধকারে রাস্তা ঠিকমত দেখা যাচ্ছে না। রাস্তার দু’ধারে বাঁশঝোপ ও জঙ্গল বোঝাই। আশপাশ থেকে কেমন যেন ভয়ানক শব্দ ভেসে আসছে করিম মিয়ার কানে। ভয়ে তার শরীর থর থর করে কাপঁছে, জোড়ে হাটতে লাগলেন তিনি। কিন্তু রাস্তা যেন আর শেষ হচ্ছে না। হঠাৎ পেছন থেকে করিম মিয়ার কাঁধে কে যেন হাত রাখল, তিনি চমকে উঠলেন এবং পেছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলেন তার সামনে একটি কঙ্কাল দাড়িয়ে আছে। আর বিকট কন্ঠে হাসছে......
     হি  হি হা হা হা, হি  হি  হা  হা  হা, হি   হি   হা   হা   হা.............

     করিম মিয়া ভয়ে ভূত ভূত ভূত বলে চিৎকার করতে করতে তার হাতের সবকিছু ফেলে দৌড়ে নিজের বাড়িতে চলে এলেন। বাড়িতে এসেই করিম মিয়া ভূত বলে চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। চিৎকার শুনে করিম মিয়ার স্ত্রী ঘর থেকে বাহিরে এসে দেখতে পান তার স্বামী মেঝেতে পড়ে রয়েছে। স্বামীর এ অবস্থা দেখে করিম মিয়ার স্ত্রী বলতে লাগলেন,
     কি হইছে আপনের? আপনে এইভাবে পইরা রইছেন কেন ? ও আমেনার বাপ আপনে কথা কননা কেন ? মা আমেনা তারাতারি বাইরে আয় তোর বাপে অজ্ঞান হইয়া গেছে।

     আমেনা দৌড়ে এসে তার মাকে জিজ্ঞাসা করে,
     বাপজানের কি হইছে মা ?
     আমিতো কিছুই বুঝতাছি নারে মা, তুই তারাতারি পানি লইয়া আয়, তোর বাপের চোখে মুখে পানি ছিটাইতে হইব।

পরদিন সকালে,
     গ্রামের সবাই ভিড় করেছে করিম মিয়ার বাড়িতে ঘটনা জানার জন্য। নিবির, শাহেদ ও আবিদ সেখানে উপস্থিত। গ্রামের অনেক মুরুব্বি এবং কুদ্দুস মিয়াও উপস্থিত সেখানে। সবাই যখন অপেক্ষা করছে করিম মিয়ার কাছ থেকে ঘটনা জানার জন্য ঠিক তখন এক ব্যক্তি করিম মিয়াকে জিজ্ঞাসা করে.....
     গত রাইতে কি হইছিল করিম মিয়া, একটু কওতো আমাগো আমাগো কাছে।
     কি আর কমু কন, সবই আমার কপালের লিখন। আমি রাইতে বাজার লইয়া বাড়ি ফিরতাছি, চারিদিক অন্ধকার আর নিরব। কেমন যান একটা ভয়ঙ্কর আওয়াজ শুনতে পাইলাম। বাশঁঝোপের সামনে দিয়া হাটতাছি, তহনই আমার কাঁধে কেডা যান হাত রাখল। আমি পেছন ফিরা চাইয়া দেহি একটা কঙ্কাল ভূত হি হি কইরা হাসতাছে। ঐ কথা মনে করলেই আমার শইলের পশম খাড়াইয়া যায়। ঐ কঙ্কাল ভূতটারে দেইখা আমি ভয়ে সবকিছু ফালাইয়া এক দৌড়ে বাড়িতে আইয়া অজ্ঞান হইয়া পরি। তারপর কি হইছে আমার আর মনে নাই।

     ( করিম মিয়ার এ ঘটনাশুনে গ্রামের সবাই ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পরে। সবার মনে এ আতঙ্কের সৃষ্টি হয় যে, গ্রামে নিশ্চই খারাপ কিছু আছর করেছে। নিবির, শাহেদ ও আবিদ এ ঘটনা শুনে হতবাক হয়ে যায়। তারা এ বিষয়টি রবিনকে জানানোর জন্যে মন স্থির করে।)

নিবির বলে উঠে,
                 চল তোরা
                 কোথায় ? জিজ্ঞাসা করে শাহেদ,
নিবির জবাব দেয়,
                 রবিনদের বাসায়
                 ঠিক আছে চল, বলে আবিদ ও শাহেদ
নিবির, শাহেদ ও আবিদ রবিনদের বাসায় এসে উপস্থিত।
শাহেদ রবিনের আম্মাকে জিজ্ঞাসা করে।
                 আন্টি কেমন আছেন ?
                 ভাল (জবাব দেয় রবিনের আম্মা)
                 তোমরা কেমন আছ ?
                 জি, আমরা সবাই ভাল আছি।
নিবির জিজ্ঞাসা করে,
                 আন্টি রবিন কি বাসায় আছে ?
                 না, ও তো একটু আগেই বেড়িয়ে গেল।
                 তাই নাকি, বলে নিবির
                 হ্যাঁ (রবিনের আম্মা)
শাহেদ বলে,
                 তাহলে আমরা এখন আসি আন্টি
                 সেকি তোমরা ঘরে এসে বস, নাস্তা কর, রবিন আসুক ওর সাথে দেখা করে তারপর যেও।
                 আজ থাক, অন্যদিন এসে না হয় নাস্তা করে যাব, বলে নিবির।
                 তা রবিনের সাথে দেখা করবে না (রবিনের আম্মা)
                 ওর সাথে পরে দেখা করব, বলে নিবির।
আবিদ বলে,   
                 আমরা তাহলে আসি
                 ঠিক আছে, আবার এসো তোমরা। (রবিনের আম্মা)
                 জি আসব।
রবিনদের বাড়ির বাইরে এসে নিবির বলতে লাগল,
                 রবিনটা যে কোথায় গেল? ওকে এই সময়ে খুব প্রয়োজন ছিল। তোরা কি বলিস ?
                 তাতো অবশ্যই,
                 কিন্তু ও গেল কোথায় ?
                 গেছে হয়ত কোথাও
আবিদ বলতে লাগল,
                 যাই হোক, আমরা এখন যার যার বাড়িতে চলে যাই, ওর সাথে পরে এসে না হয় দেখা করব। ঠিক আছে।
                 ওকে ঠিক আছে।

২.
ঐ দিন রাতে আবার,
                 হোসেন আলী ঐ রাস্তা দিয়েই বাড়ি ফিরছেন। পথে আবুলের সাথে দেখা হয় তার, হোসেন আলী আবুল কে জিজ্ঞাসা করে, কি আবুল যাও কই ?
                 বাজারে যাই, আপনে কই যান চাচা ?
                 বাড়িত যাই
                 বাজার কইরা আইলেন বুঝি
                 হ, দুগা সদাই-পাতি কিননা আনলাম,
                 অন্ধকার রাস্তা, একটু সাবধানে যাইয়েন চাচা
                 আইচ্ছা বাবা যাই।

হোসেন আলী হাটতে হাটতে ঝোপের সামনে চলে এসেছেন, আস্তে আস্তে হেটে চলেছেন তিনি। কোন সারা শব্দ নাই, হ্যারিকেন হাতে হেটে চলেছেন হোসেন আলী। হঠাৎ তার ডান পাশের ঝোপ নড়ে উঠল, তিনি কিছুটা চমকে উঠলেন, তিনি হ্যারিকেন দিয়ে দেখলেন একটি বিড়াল ঝোপের মধ্যে বসে রয়েছে। আবার একটু এগোতেই তার বাম পাশের ঝোপটা নড়ে উঠল, কিন্তু এবার হোসেন শেখ কিছুই দেখতে পেলেন না। তিনি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলেন, তিনি মনে মনে দোয়া পড়তে লাগলেন, কিছুদূর এগোতেই এবার তার কাঁধে কার যেন হাত পড়ল। তিনি চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখেন...........................          (চলবে)

© 2011 Bikrompur Sahittya Parishad, All Rights Reserved  | Designed & Developed by Liakot Ali Khan

তারকা কথা

 রফিকউল্লাহ সেলিম। পিতাঃ আলহাজ্ব মোঃ কলিমউল্লাহ। আদি নিবাস মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায়। জন্ম ১৯৬৭ সালের ৪ আগষ্ট। শিক্ষা জীবন শুরু সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স হাই স্কুলে। এস.এস.সি পাশ করেন ১৯৮৩ সালে। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে। ঢাকা তেজগাঁও কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পাশ করেন ১৯৮৫ সালে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানে অনার্সে ভর্তি হন। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক কারণে অনার্স বন্ধ রেখে ১৯৯০ সালে প্রাইভেট বি.এ পাশ করেন।

     এদেশের নাট্যাঙ্গনে রফিকউল্লাহ সেলিম একটি সুপরিচিত নাম। স্কুল জীবনে রামপুরা সমাজ কল্যাণ সংঘ, অনুসন্ধিৎসু বিজ্ঞান ক্লাব ইত্যাদি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৮৫ সালে সেলিম ঢাকা নান্দনিক সংগঠনের সাথে জড়িত হন। এখন তিনি ঢাকা নান্দনিকের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। লিও ক্লাব অব ঢাকা মেট্রোপলিটন এর সেক্রেটারী ছিলেন ৯২-৯৪ পর্যন্ত। প্যাকেজ নির্মাতা হিসেবে সেলিম প্যাকেজ প্রোগ্রাম নির্মাতা ফোরামের কার্যনির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া সে বাংলাদেশ গ্রুপ-থিয়েটার ফেডারেশন ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের একজন সক্রিয় কর্মী।

     রফিকউল্লাহ সেলিমের অভিনয় জীবনের শুরু হয় ১৯৮৫ সালে পথ নাটক সাপের খেইল এ অভিনয়ের মাধ্যমে। এরপর এখানে হায়েনার মুখ, আমরা দিওয়ানা, লীলা ও রাজাকারের কিসসা নাটকের ২২টি প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। সাবধান ওরা আসছে, শ্যামলী কেবলই নীল হয়, ৩৪ এর প্যারাসাইট এবং হটাৎ মঞ্চ নাটকের শতাধিক প্রদর্শনীতে সেলিমের সু-অভিনয় নাট্যামোদী মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। লীলা, রাজাকারের কিসসা, তিনি আসছেন ও ঘা নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। ১৯৯১ সালে ‘বারো রকম মানুষ’ ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করার মাধ্যমে টেলিভিশন নাট্য শিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। এরপর রূপনগর ও সারাবেলা ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেন। শতাধিক প্যাকেজ নাটকেও তিনি অভিনয় করেছেন। প্যাকেজ অনুষ্ঠান নির্মাতা হিসেবে সেলিম আত্মপ্রকাশ করেন ১৯৯৫ সালে। একিউরেট প্রযোজনা সংস্থা থেকে অচেনা, মহুয়া ও সহ¯্রধারা নাটকের পরিচালক ও প্রযোজক তিনি। খান আতাউর রহমান পরিচালিত ‘এখনও অনেক রাত’ চলচ্চিত্রেও সেলিম অভিনয় করেছেন। বন্ধুত্ব, ধারাবাহিক নাটক অরণ্যের কাছে ফিরে আসা, অভিমান পর্ব সহ ঈদের নাটক বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার হয়েছে।

     ব্যক্তিগত জীবনে সেলিম একজন সফল ব্যবসায়ী। প্যাকেজ নাটক নির্মান, বিজ্ঞাপনী এজেন্সী, পৈতৃক ব্যবসা লঞ্চ সার্ভিস এবং কোল্ড ষ্টোরেজ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সেলিম সবার বড়। বিবাহিত এবং দুই কন্যা এবং এক পুত্র সন্তানের জনক।

     বর্তমানে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন এর প্রশিক্ষণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন ও টেলিভিশন প্যাকেজ নির্মাতা ফোরাম এর কার্যনির্বাহী সদস্য।

     অভিনয়ের পদক প্রাপ্তিঃ
     বাচসাস, বাবিসাস, টেলিভিশন দর্শক ফোরাম সহ বেশ কয়েকটি পদক পান তিনি।

© 2011 Bikrompur Sahittya Parishad, All Rights Reserved  | Designed & Developed by Liakot Ali Khan

জগদীশচন্দ্র বসু

জগদীশচন্দ্র বসু ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর ময়মনসিংহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ভগবানচন্দ্র বসু। মায়ের নাম বামা সুন্দরী। জগদীশচন্দ্রের পৈতৃক বাড়ি বিক্রমপুরের রাঢ়িখাল গ্রামে। ভারতবর্ষে বিক্রমপুর এক শ্রদ্ধা জাগানো নাম। বিক্রমপুরে জন্মেছেন অনেক জগৎ বিখ্যাত মনীষী। তাদের মধ্যে অতীশ দীপংকর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নাম অন্যতম।
    
     জগদীশচন্দ্রের পিতা ভগবানচন্দ্র বসু ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট। এ ছাড়াও তিনি স্বদেশী আন্দোলন, ব্যবসা বাণিজ্য, নিজ গ্রামাঞ্চলের বেকার যুবকদের জন্য কারিগরি শিক্ষার স্কুল পরিচালনা, কৃষকদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করাসহ নানাবিধ সেবামূলক কাজে জড়িত ছিলেন। জগদীশচন্দ্রের মা বামা সুন্দরী ছিলেন অতিশয় ¯েœহশীলা। ভগবানচন্দ্র বসুর কর্মস্থল তখন ফরিদপুর। জগদীশচন্দ্র বসুকে প্রথম ভর্তি করা হয় ওই শহরের একটি বাংলা স্কুলে। তখন অভিজাতদের মধ্যে ছেলেমেয়েকে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করানোর প্রবণতা ছিল। ভগবানচন্দ্র বসু সব সময়ই মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগী ছিলেন। ওই স্কুলে জগদীশের সহপাঠী প্রায় সবাই ছিল অতি সাধারণ ও দরিদ্র ঘরের সন্তান। তাদের সঙ্গে মিশে, খেলাধূলা করতে করতে শিশু জগদীশের সামনে প্রকৃতি, গাছপালা ও কীটপতঙ্গের এক জগৎ ধরা দেয়।

    একবার এক ডাকাত সর্দার দীর্ঘদিন হাজতবাসের পর ডেপুটি মেজিষ্ট্রেট ভগবানচন্দ্র বসুর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে। ভগবানচন্দ্র দয়া পরবশত ডাকাত সর্দারকে শিশু জগদীশচন্দ্রকে দেখাশোনার জন্য নিয়োগ করেন। এরপর থেকে ডাকাতটির স্বভাব চরিত্রে আমূল পরিবর্তন আসে। ডাকাত সর্দারের কাঁধে চড়ে শিশু জগদীশ প্রতিদিন স্কুলে যেতেন আর আসতেন। যাওয়ার এবং আসার পথে কতো গল্প শুনতেন তিনি। একটিও মিথ্যে গল্প নয়, তার ডাকাতি জীবনের নানা ঘটনা। খেলাধূলায়ও জগদীশের খুব আর্কষণ ছিল। ফরিদপুরে তার একটি ক্রিকেট টিমও ছিল। বাবা তাকে একটি টাট্টু ঘোড়া কিনে দিয়েছিলেন। সেই বয়সেই জগদীশচন্দ্র ঘোড়া চালনায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। কিছুদিনের মধ্যেই ফরিদপুর শহরে এক ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন স্থানীয় জনগণ। নিজের ঘোড়ায় চড়ে জগদীশ ওই প্রতিযোগিতা দেখতে গিয়েছিলেন, সঙ্গে সাথী হিসেবে ওই ডাকাত সর্দার। ছোট ঘোড়া দেখে একজন প্রতিযোগী ঠাট্টাচ্ছলে জগদীশচন্দ্রকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে আহবান করেন। জগদীশও কিছু না ভেবে রাজি হয়ে যান। এর আগে কখনও জগদীশ ঘোড়া দৌড়ে অংশগ্রহণ করেন নি। তারপরও তিনি ভয় পেলেন না। যদিও প্রতিযোগিতায় না থেমে তিনি সবার শেষে পৌছেন।
    
     জগদীশচন্দ্রের বয়স যখন দশ বছর, অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার হিসেবে বাবা বদলি হন বর্ধমানে। তখন পর্যন্ত বর্ধমান ছিল খুব স্বাস্থ্যকর জায়গা। কিন্তু এক বছরের মধ্যে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার মানুষ মারা যায় সেখানে। ভগবানচন্দ্র স্বভাবতই দুঃস্থ মানুষের সেবায় নেমে পড়েন।

     ভগবানচন্দ্র ছেলেকে কলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি করে দেন। সেখানে মাস তিনেক পড়াশোনার পর তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে ভর্তি হন। তখন তার সহপাঠী অধিকাংশই ছিল ইংরেজ সন্তান। তারা সবাই ইংরেজিতে কথাবার্তা বলতো। জগদীশচন্দ্র তাদের সাথে আলাপ করতে পারতেন না। প্রথমদিনই শান্তশিষ্ট জগদীশকে ক্লাসের সেরা মুষ্টিযোদ্ধার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়। তার নাক ফেটে রক্ত পড়েছে সেদিন।

     সেন্ট জেভিয়ার্সের যে হোস্টেলে তার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল, সেখানে তিনি ছিলেন সবার ছোট। যার কারণে কারও সঙ্গে তেমন গাঢ় বন্ধুত্ব হয়নি তার। তাই তিনি নিঃসঙ্গতা কাটাবার জন্য হোস্টেলের আঙিনার পাশে ছোট্ট একটি বাগান করেন এবং হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে পশুপাখি কিনতেন এবং তাদের দেখাশুনা করতেন। সময় যে কখন পেরিয়ে যেতো টেরও পেতেন না তিনি। মাত্র ষোল বছর বয়সে ১৮৭৫ সালে জগদীশচন্দ্র বসু সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি লাভ করেন। একই বছরে তিনি সেন্ট জেভিয়ার্সের কলেজ শাখায় ভর্তি হন। সেখানে ল্যাটিন ছিল তার অন্যতম বিষয়। কলেজে তিনি বেলজীয় পদার্থ বিজ্ঞানী ফাদার অরজিন লাঁফোর সংস্পর্শে আসেন এবং তার কাছাকাছি চারটি বছর কাটান। চল্লিশ বছর ধরে ফাদার লাঁফো ভারতীয় বাঙালিদের বিজ্ঞান শিক্ষা দান করেছেন। তার পড়াশোনার ভঙ্গি, প্রাঞ্জল বর্ণনা জগদীশচন্দ্রের খুব ভালো লাগতো। তার কাছ থেকে জগদীশচন্দ্র তত্ত্বালোচনার নিয়ম কানুন এবং তত্ত্ব ব্যাখ্যার পারদর্শিতা আয়ত্ব করেছিলেন। ফাদার লাঁফোই জগদীশচন্দের বিজ্ঞান গবেষণার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন।

     ১৮৭৭ সালে জগদীশচন্দ্র দ্বিতীয় বিভাগে এফ.এ.(বর্তমান এইচ.এস.সি) পাশ করেন। পড়াশুনার বাইরেও তিনি নানাবিধ কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করতেন। কলেজের দীর্ঘ ছুটিতে তিনি একবার মাসাধিকাল হিমালয়ের অরণ্য ভূমি তরাইয়ে কাটান। এ সময় তিনি খুব কাছ থেকে বন্য জীবজন্তু দেখেন এবং বন্দুক চালাতে শিখেন। এর দু’মাস পরে বনে বেড়ানো ও শিকারের লোভে আসাম বেড়াতে গিয়ে হিংস্র মশার কামড়ে কঠিন কালাজ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। কলকাতায় ফিরে তার সুস্থ হতে দীর্ঘদিন লেগেছিল। কিন্তু কখনওই সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করেননি। এই কালাজ্বরের কারণে তিনি বিলাতে ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

     ¯œাতক পাশ করার পর জগদীশচন্দ্র বসু ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য বিলাত যাবার সিদ্ধান্ত নেন এবং পিতাকে তা জানান কিন্তু এতে পিতা সম্মতি দিলেন না। ঠিক হলো ছেলেকে বিলাত পাঠানো হবে উচ্চ শিক্ষার জন্য। তখন সমস্যা দেখা দিল টাকার। ব্রিটিশ সরকারের একজন সহকারী কমিশনার টাকার অভাবে ছেলেকে বিলাত পাঠাতে পারছেন না। নানান প্রচেষ্টায় অর্থসংগ্রহের পর তবেই জগদীশকে বিলাত পাঠানো হয়।

     লন্ডন পৌঁছে জগদীশচন্দ্র দেখলেন কলকাতার বি.্এ. ডিগ্রির মান ওখানকার ম্যাট্রিকের সমপর্যায়ের। তাই ডাক্তারি পড়ার আগে তাকে রসায়ন, পদার্থ, উদ্ভিদ ও প্রাণীবিদ্যা পড়তে হলো কিছুদিন। এরপরে ১৮৮০ সালে জগদীশচন্দ্র বসু ডাক্তারিতে ভর্তি হন। কিন্তু তিনি পুনরায় কালাজ্বরে আক্রান্ত হন। বার বার অসুস্থ হয়ে পড়ায় ডাক্তার তাকে মেডিক্যাল পড়া বাদ দিতে বলেন। এরপর ডাক্তারি পড়া ছেড়ে তিনি ক্রাইস্ট কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু বিষয় নির্বাচনে  তিনি দ্বিধা দ্বন্দ্বে ছিলেন। অবসর সময়ে জগদীশ খ্যাতনামা প-িতদের বক্তৃতা শুনতেন। এভাবে এক বছর কেটে যায়। প্রথম বছর তিনি রসায়ন, পদার্থবিদ্যা ও ভূ-তত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনা করেন। রসায়ন, পদার্থবিদ্যা ও উদ্ভিদবিদ্যা ছিল তার দ্বিতীয় বছরের পাঠ্য বিষয়। ১৮৮৩ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাইস্ট কলেজ থেকে তিনি প্রকৃতি বিজ্ঞানে ট্রাইপোসসহ অনার্স পাস করেন।

     জগদীশচন্দের ট্রাইপোসের রেজাল্টে মুগ্ধ হয়ে কোনও রকম গবেষণা ছাড়াই লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ই.ঝপ. ডিগ্রি প্রদান করে। ১৮৮৪ সালে বিলাতের শিক্ষা শেষে জগদীশচন্দ্র ভারতে ফিরে আসেন। ১৮৮৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী জগদীশচন্দ্র দুর্গামোহন দাশ ও ব্রক্ষময়ী দাশের দ্বিতীয় কন্যা অবলা দাশকে বিয়ে করেন। দুর্গামোহন দাশ ছিলেন জগদীশচন্দ্রের পিতা ভগবানচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অবলা দাশ ১৮৮১ সালে প্রবেশিকা পাশ করে ১৮৮৪ সালে ডাক্তারি পড়ার জন্যে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে আবেদন করেন। আবেদন পত্রটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট সভায় আলোচিত হয়। কিন্তু মেয়ে হবার কারণে তার আবেদন মঞ্জুর হয় নি। বাঙালি মেয়েদের তখন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়ার নিয়ম ছিলনা।

     দুর্গামোহন দাশ মেয়েকে জেদ করে মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করে দেন। অবলা দাশ যখন জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন তখন তিনি ৩য় বর্ষের ছাত্রী। পরবর্তীতে তিনি লেডি অবলা বসু বা লেডি বসু নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন। বিয়ের পর তিনি ডাক্তারি ছেড়ে দিয়ে সংসার কর্মে ব্রতী হন। ইতিমধ্যে জগদীশচন্দ্র বসু ইম্পেরিয়াল সার্ভিসে যোগ দিয়েছেন। তাকে প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিদ্যার অস্থায়ী অধ্যাপকের পদ দেয়া হয়। জগদীশচন্দ্র যখন চাকরিতে ঢোকেন তখন সর্বভারতীয় সার্ভিসেও ইউরোপীয় ও ভারতীয়দের মাইনের অনেকখানি তফাৎ হতো। একজন ইউরোপীয়র তুলনায় তিনভাগের দুই ভাগ মাত্র পেতেন একজন ভারতীয়। জগদীশচন্দ্র এই অবস্থা কিছুতেই মেনে নিলেন না। তিনি ঠিক করলেন একদিকে তিনি কলেজে তার কাজ চালিয়ে যাবেন, অন্যদিকে মাইনের এই পার্থক্য ঘুচিয়ে দেবার জন্য সমানে প্রতিবাদ জানিয়ে যাবেন। এটা ছিল তার কাছে জাতীয় মান অপমানের প্রশ্ন। প্রতিবাদে যখন কোনও ফল হলো না তখন জগদীশচন্দ্র বসু কাজ করে যেতে লাগলেন কিন্তু বেতন নিতেন না।

     চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও অবলা বসু স্বামীর পাশে থেকে উৎসাহ জুগিয়েছেন। স্ত্রীর পরামর্শে তখন তিনি চন্দননগরে হুগলী নদীর তীরে একটি বাড়ী ভাড়া নেন। এই বাড়িটির নাম ছিল “পাতালপুরী”। বলাবাহুল্য কলকাতার তুলনায় চন্দননগরে বাড়ি ভাড়া তখন অনেক কমছিল। হুগলী নদী পার হয়ে জগদীশচন্দ্র নৈহাটি স্টেশনে আসতেন। নৈহাটি থেকে ট্রেনে শিয়ালদহ স্টেশনে নেমে প্রেসিডেন্সি কলেজে যেতেন প্রতিদিন। লেডি বসু তাদের নিজস্ব জেলিবোট বেয়ে চন্দননগর থেকে প্রায় প্রতিদিন বিকালে নৈহাটি ঘাটে যেতেন জগদীশচন্দ্রকে আনতে। তাদের বিয়ের প্রথম বছরটি এভাবেই কেটে যায়। এরপর চন্দননগর থেকে তিনি চলে আসেন মেছোবাজার স্ট্রীটে। বোন সুর্বণপ্রভা বসুর সঙ্গে শেয়ারে বাসা ভাড়া নেন। এই বাড়ির সামনে ছিল বাগান, খেলার মাঠ ও পুকুর। ১৮৯২ সাল পর্যন্ত তারা এই বাড়িতে ছিলেন। পরে ইন্টালির কনভেন্ট রোডে একটি বাড়ি ভাড়া নেন। এবং নিজের রুগ্ন অসুস্থ বাবা-মাকে নিয়ে আসেন। এই বাড়িতেই তিন বছরের ব্যবধানে জগদীশচন্দ্র বসু তার বাবা (১৮৯২) ও মাকে (১৮৯৪) হারান। (চলবে...)
(সংকলিত)


© 2011 Bikrompur Sahittya Parishad, All Rights Reserved  | Designed & Developed by Liakot Ali Khan